রসায়নের জগতে যোজনী একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি মৌলের রাসায়নিক সংযোগের ক্ষমতা নির্দেশ করে। সহজ ভাষায়, যোজনী হলো কোনো মৌলের একটি পরমাণু কতগুলো হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে সংযুক্ত হতে পারে বা অন্য মৌলের পরমাণুকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এই লেখায় আমি যোজনী কাকে বলে? সক্রিয় যোজনী ও সুপ্ত যোজনী কাকে বলে সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
যোজনী কাকে বলে?
যখন দুই বা ততোধিক ভিন্ন মৌলের পরমাণু রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয়ে একটি যৌগের অণু তৈরি করে, তখন এই সংযোগ নির্দিষ্ট নিয়মের ভিত্তিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ:
- ক্লোরিনের একটি পরমাণু হাইড্রোজেনের একটি পরমাণুর সাথে মিলে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড (HCl) তৈরি করে।
- অক্সিজেনের একটি পরমাণু হাইড্রোজেনের দুটি পরমাণুর সাথে মিলে পানি (H₂O) তৈরি করে।
- নাইট্রোজেনের একটি পরমাণু হাইড্রোজেনের তিনটি পরমাণুর সাথে মিলে অ্যামোনিয়া (NH₃) তৈরি করে।
- কার্বনের একটি পরমাণু হাইড্রোজেনের চারটি পরমাণুর সাথে মিলে মিথেন (CH₄) তৈরি করে।
এই উদাহরণগুলো থেকে বোঝা যায়, বিভিন্ন মৌলের পরমাণু হাইড্রোজেনের বিভিন্ন সংখ্যক পরমাণুর সাথে সংযুক্ত হয়। এই সংযোগ ক্ষমতাকে বলা হয় যোজনী। অর্থাৎ, কোনো মৌলের একটি পরমাণু হাইড্রোজেনের যতগুলো পরমাণুর সাথে সংযুক্ত হতে পারে বা অন্য যৌগ থেকে হাইড্রোজেনের যতগুলো পরমাণু প্রতিস্থাপন করতে পারে, সেই সংখ্যাই হলো মৌলটির যোজনী।
যোজনীর প্রকারভেদ
মৌলের যোজনী অনুসারে এদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
- একযোজী মৌল: যে মৌলের যোজনী ১, তাদের একযোজী মৌল বলে। যেমন: হাইড্রোজেন, ক্লোরিন, ফ্লোরিন, সোডিয়াম।
- দ্বিযোজী মৌল: যে মৌলের যোজনী ২, তাদের দ্বিযোজী মৌল বলে। যেমন: অক্সিজেন, সালফার, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম।
- ত্রিযোজী মৌল: যে মৌলের যোজনী ৩, তাদের ত্রিযোজী মৌল বলে। যেমন: নাইট্রোজেন, অ্যালুমিনিয়াম।
- চতুর্যোজী মৌল: যে মৌলের যোজনী ৪, তাদের চতুর্যোজী মৌল বলে। যেমন: কার্বন।
সক্রিয় যোজনী ও সুপ্ত যোজনী
- সক্রিয় যোজনী: কোনো মৌল যখন তার পূর্ণ যোজনী ক্ষমতা ব্যবহার করে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে, তখন তাকে সক্রিয় যোজনী বলা হয়। যেমন, অক্সিজেন পানি তৈরি করতে তার দুটি যোজনী ব্যবহার করে।
- সুপ্ত যোজনী: কিছু মৌল তাদের পূর্ণ যোজনী ক্ষমতা ব্যবহার না করে কেবল আংশিকভাবে সংযুক্ত হয়। এই অব্যবহৃত যোজনী ক্ষমতাকে সুপ্ত যোজনী বলে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু জটিল যৌগে মৌলের যোজনী আংশিকভাবে ব্যবহৃত হয়।
যোজনী রসায়নের একটি মৌলিক ধারণা, যা মৌলের সংযোগ ক্ষমতা বোঝায়। এটি যৌগ গঠনের নিয়ম বুঝতে সাহায্য করে। সক্রিয় এবং সুপ্ত যোজনী সম্পর্কে জানা রাসায়নিক বন্ধনের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। এই জ্ঞান ছাত্র এবং রসায়নপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবর্তনশীল যোজনী কাকে বলে
রসায়নের জগতে যোজনী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যোজনী হলো কোনো মৌলের অন্য মৌলের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ক্ষমতা। কিছু মৌলের যোজনী বিভিন্ন অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন হয়। এই ধরনের যোজনীকে পরিবর্তনশীল যোজনী বলা হয়। এই লেখায় আমরা পরিবর্তনশীল যোজনী এবং সক্রিয় ও সুপ্ত যোজনীর ধারণা সহজ ভাষায় বুঝবো।
কিছু মৌলের যোজনী তাদের যৌগের ধরনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। যে মৌলের একাধিক যোজনী থাকে, তাকে পরিবর্তনশীল যোজনী বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে আয়রনের কথা বলা যায়। আয়রন দুই ধরনের যৌগ তৈরি করে:
- ফেরাস যৌগ: এখানে আয়রনের যোজনী ২। যেমন, ফেরাস সালফেট (FeSO₄)।
- ফেরিক যৌগ: এখানে আয়রনের যোজনী ৩। যেমন, ফেরিক ক্লোরাইড (FeCl₃)।
এই দুই ধরনের যোজনীর কারণেই আয়রনের যোজনীকে পরিবর্তনশীল যোজনী বলা হয়। এটি রসায়নের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সক্রিয় যোজনী কাকে বলে
কোনো যৌগে মৌলের কার্যকরী যোজনীকে সক্রিয় যোজনী বলা হয়। এটি সেই যোজনী, যা মৌলটি যৌগে থাকা অবস্থায় প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) যৌগে কার্বনের সক্রিয় যোজনী ৪। কারণ কার্বন এখানে দুটি অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই যোজনী দেখায়।
সুপ্ত যোজনী কাকে বলে
সুপ্ত যোজনী হলো মৌলের সর্বোচ্চ যোজনী এবং সক্রিয় যোজনীর মধ্যে পার্থক্য। উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক:
- কার্বনের উদাহরণ: কার্বনের সর্বোচ্চ যোজনী ৪। কিন্তু কার্বন মনোক্সাইড (CO) যৌগে কার্বনের সক্রিয় যোজনী ২। তাই সুপ্ত যোজনী হলো ৪ – ২ = bottled। এই ২ কে CO যৌগে কার্বনের সুপ্ত যোজনী বলা হয়।
- ফসফরাসের উদাহরণ: ফসফরাসের সর্বোচ্চ যোজনী ৫। ফসফরাস ট্রাইক্লোরাইড (PCl₃) যৌগে ফসফরাসের সক্রিয় যোজনী ৩। তাই সুপ্ত যোজনী হলো ৫ – ৩ = ২।
পরিবর্তনশীল যোজনী এবং সক্রিয়-সুপ্ত যোজনী রসায়নের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া এবং যৌগের গঠন বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এটি রাসায়নিক বন্ধন, যৌগের নামকরণ এবং প্রতিক্রিয়ার ধরন নির্ধারণে সাহায্য করে।এই ধারণাগুলো বুঝলে রসায়নের পড়াশোনা আরও সহজ এবং আকর্ষণীয় হয়। পরিবর্তনশীল যোজনী বোঝা মৌলের বৈচিত্র্য এবং রাসায়নিক আচরণ সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়।
যোজনী হলো রসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা মৌল বা যৌগমূলকের অন্য মৌলের সাথে বন্ধন গঠনের ক্ষমতা নির্দেশ করে। এটি বোঝায় কোনো মৌল বা যৌগমূলক কতটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে যুক্ত হতে পারে। এই পোস্টে আমরা বিভিন্ন মৌল ও যৌগমূলকের যোজনী সম্পর্কে সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
মৌলের যোজনী
মৌলের যোজনী তাদের রাসায়নিক বন্ধন গঠনের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। নিচে বিভিন্ন মৌলের যোজনী দেওয়া হলো:
- একযোজী মৌল: এই মৌলগুলো একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে বন্ধন তৈরি করতে পারে। উদাহরণ: হাইড্রোজেন, ফ্লোরিন, ক্লোরিন, ব্রোমিন, আয়োডিন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, কপার (I), সিলভার।
- দ্বিযোজী মৌল: এই মৌলগুলো দুটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে বন্ধন গঠন করে। উদাহরণ: অক্সিজেন, সালফার, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, জিংক, কপার (II), আয়রন (II), টিন (II), লেড (II), বেরিয়াম।
- ত্রিযোজী মৌল: এরা তিনটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে বন্ধন তৈরি করে। উদাহরণ: বোরন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, অ্যালুমিনিয়াম, ক্রোমিয়াম, আয়রন (III)।
- চতুর্যোজী মৌল: এই মৌলগুলো চারটি বন্ধন তৈরি করতে পারে। উদাহরণ: কার্বন, সিলিকন, সালফার, টিন (IV), লেড (IV)।
- পঞ্চযোজী মৌল: এরা পাঁচটি বন্ধন গঠন করে। উদাহরণ: নাইট্রোজেন, ফসফরাস।
- ষড়যোজী মৌল: এই মৌল ছয়টি বন্ধন তৈরি করতে পারে। উদাহরণ: সালফার।
যৌগমূলকের যোজনী
যৌগমূলক হলো দুই বা ততোধিক মৌলের সমন্বয়ে গঠিত গ্রুপ, যারা একটি ইউনিট হিসেবে কাজ করে। নিচে তাদের যোজনী দেওয়া হলো:
- একযোজী যৌগমূলক: অ্যামোনিয়াম, নাইট্রেট, হাইড্রক্সাইড, নাইট্রাইড, হাইড্রোজেন সালফেট, সায়ানাইড।
- দ্বিযোজী যৌগমূলক: সালফাইট, সালফেট, থায়োসালফেট, ক্রোমেট, ডাইক্রোমেট, সিলিকেট।
- ত্রিযোজী যৌগমূলক: ফসফেট।
যোজনী রসায়নের একটি মৌলিক বিষয়, যা রাসায়নিক যৌগ গঠনের নিয়ম বোঝাতে সাহায্য করে। এই পোস্টে আমরা বিভিন্ন মৌল ও যৌগমূলকের যোজনী সম্পর্কে সহজভাবে আলোচনা করেছি। আশা করি, এই লেখাটি পড়ে আপনি যোজনী কাকে বলে? সক্রিয় যোজনী ও সুপ্ত যোজনী কাকে বলে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন।










