পলাশির যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল। পলাশির যুদ্ধের পটভূমি।

Written by Jarif Al Hadee

Published on:

পলাশির যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা ১৭৫৭ সালে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধ শুধু বাংলার নয়, পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন এনেছিল। এই যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীতে ভারতের উপর তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি তৈরি করে। এই নিবন্ধে পলাশির যুদ্ধের পটভূমি, কারণ এবং ফলাফল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

পলাশির যুদ্ধের পটভূমি

১৭৪০ থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার নবাব ছিলেন আলীবর্দি খান। তিনি তাঁর শাসনকালে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও সফলভাবে রাজ্য পরিচালনা করেন। মারাঠা এবং বর্গিদের আক্রমণের বিরুদ্ধে তিনি কঠোরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং ইংরেজ বণিক কোম্পানিকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তবে, ১৭৫৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বাংলার রাজনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়। আলীবর্দি খান তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমেনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মনোনীত করেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা নবাবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে, তাঁর শাসনকালে তিনি একাধিক ষড়যন্ত্র এবং সমস্যার সম্মুখীন হন।

সিরাজউদ্দৌলার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল পরিবারের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র। আলীবর্দি খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগম সিরাজের নবাব হওয়ায় ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ঘসেটি বেগমের দেওয়ান রাজা রাজবল্লভ, পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকত জঙ্গ এবং আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেন। সিরাজউদ্দৌলা কৌশলের মাধ্যমে ঘসেটি বেগমকে নজরবন্দি করেন এবং শওকত জঙ্গের বিদ্রোহ দমন করে পূর্ণিয়া দখল করেন। তবে, এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা দমন করলেও বাইরের ষড়যন্ত্র তাঁর জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে ওঠে। দেশি-বিদেশি বণিক শ্রেণি, নবাবের দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সেনাপতি মীর জাফরের মতো ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন। এই ষড়যন্ত্রই পলাশির যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে।

পলাশির যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল

পলাশির যুদ্ধের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, যা বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত। এই কারণগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

  1. ইংরেজদের অসৌজন্যমূলক আচরণ: সিরাজউদ্দৌলা নবাব হওয়ার পর ইংরেজরা প্রথাগতভাবে তাঁকে কোনো উপঢৌকন পাঠায়নি বা সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করেনি। এই আচরণে নবাব ক্ষুব্ধ হন এবং ইংরেজদের প্রতি তাঁর মনোভাব কঠোর হয়।
  2. কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ: নবাবের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইংরেজরা কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ অব্যাহত রাখে। এটি নবাবের ক্ষমতার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়।
  3. দস্তকের অপব্যবহার: ইংরেজ কোম্পানি দস্তকের (বাণিজ্যের ছাড়পত্র) অপব্যবহার করে দেশীয় বণিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। নবাব এই অপব্যবহার বন্ধ করতে আদেশ দিলেও ইংরেজরা তা মানেনি।
  4. চুক্তি ভঙ্গ ও কর প্রদানে অস্বীকৃতি: আলীবর্দি খানের সঙ্গে ইংরেজদের চুক্তি অনুযায়ী তারা নবাবকে কর দেবে। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলার সময়ে তারা কর দিতে অস্বীকার করে এবং স্থানীয় জনগণের উপর অত্যাচার শুরু করে।
  5. কৃষ্ণদাসের আশ্রয় প্রদান: রাজা রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে কলকাতায় ইংরেজদের কাছে আশ্রয় নেন। নবাব তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দূত পাঠালে ইংরেজরা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। এছাড়া শওকত জঙ্গের বিদ্রোহের সময় ইংরেজরা বিদ্রোহীদের সমর্থন করে, যা নবাবের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই কারণগুলো পলাশির যুদ্ধের জন্য মূল ভূমিকা পালন করে। ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের সম্পর্ক ক্রমশ উত্তপ্ত হয় এবং এই উত্তেজনা যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়।

পলাশির যুদ্ধের পরে কী হয়েছিল

পলাশির যুদ্ধের পরে কী হয়েছিল

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের পেছনে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল অন্যতম কারণ। তিনি ইংরেজদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে যুদ্ধে নবাবের পক্ষে লড়াই করেননি। এই যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী এবং বাংলার ভাগ্যে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। নিম্নে এর ফলাফলগুলো উল্লেখ করা হলো:

  1. ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা: পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
  2. সিরাজউদ্দৌলার পতন: যুদ্ধে পরাজয়ের পর সিরাজউদ্দৌলা পালিয়ে যান, কিন্তু শীঘ্রই ধরা পড়েন এবং মীর জাফরের আদেশে তাঁকে হত্যা করা হয়।
  3. মীর জাফরের নবাব পদ: ইংরেজরা মীর জাফরকে বাংলার নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে তিনি কেবল নামমাত্র নবাব ছিলেন, কারণ প্রকৃত ক্ষমতা ছিল ইংরেজদের হাতে।
  4. অর্থনৈতিক শোষণ: পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজরা বাংলার অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা বাণিজ্যের নামে দেশীয় বণিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করে।
  5. ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা: পলাশির যুদ্ধ ছিল ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম ধাপ। এই যুদ্ধের ফলে ইংরেজরা ক্রমশ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও তাদের প্রভাব বিস্তার করে।

পলাশির যুদ্ধ ছিল বাংলার ইতিহাসে একটি ট্র্যাজিক ঘটনা, যা শুধু সিরাজউদ্দৌলার পতনই নয়, বাংলার স্বাধীনতার অবসানও ঘটায়। এই যুদ্ধের পেছনে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, ইংরেজদের কূটকৌশল এবং নবাবের সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলস্বরূপ, বাংলা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায় এবং এই অঞ্চলের জনগণ দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হয়। পলাশির যুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের একটি শিক্ষণীয় ঘটনা, যা আমাদের ঐক্য ও সতর্কতার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।

পড়াশোনা সম্পর্কিত আরও তথ্য জানতে আমাদের ওয়েবসাইট Admissiongo.com নিয়মিত ভিজিট করুন এবং আমাদের সঙ্গে থাকুন।

DMCA.com Protection Status
Jarif Al Hadee

হ্যালো, আমি জারীফ আল হাদী- Jarif Al Hadee। আমি এই ওয়েবসাইটের এডমিন এবং একজন লেখক। আমি দীর্ঘ ৪ বছর ধরে শিক্ষা সম্পর্কিত লেখালেখির সাথে জড়িত। আমি পাঠকদের মানসম্মত ও আপডেটেড তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করি আমার লেখাগুলোতে। যোগাযোগ- admissiongodesk@gmail.com।