জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড আমাদের জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি শুধু আমাদের পরিচয় নিশ্চিত করে না, বরং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কাজে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তবে অনেক সময় এনআইডি কার্ডে নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম বা অন্যান্য তথ্যে ভুল হয়ে যায়। এই ভুলগুলো সংশোধন করা জরুরি, কারণ ভুল তথ্যের কারণে ব্যাংকিং, শিক্ষা, চাকরি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
এনআইডি কার্ডে ভুল হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কখনও আবেদনের সময় ভুল তথ্য প্রদান, ডাটা এন্ট্রির সময় ভুল বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে এই সমস্যা হয়। সাধারণ কিছু ভুলের মধ্যে রয়েছে:
- নামের বানানে ভুল
- জন্মতারিখ বা জন্মসাল ভুল
- বাবা-মায়ের নামের ত্রুটি
- ঠিকানা বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের ভুল
এই ভুলগুলো সংশোধন করা এখন অনলাইনের মাধ্যমে অনেক সহজ। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট এবং এনআইডি ওয়ালেট অ্যাপ ব্যবহার করে আপনি ঘরে বসেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন।
এনআইডি কার্ড সংশোধনের নিয়ম
এনআইডি কার্ড সংশোধনের জন্য আপনাকে ধাপে ধাপে কিছু পদক্ষেপ অনুসরণ করতে হবে। নিচে বিস্তারিতভাবে এই প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হলো:
১. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রবেশ
প্রথমে আপনার যেকোনো ওয়েব ব্রাউজার (যেমন: Google Chrome, Firefox) ওপেন করুন। এরপর সার্চ বারে “বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন” লিখে সার্চ করুন। সার্চ ফলাফলে আপনি বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট দেখতে পাবেন। এর মধ্যে যে ওয়েবসাইটে ecs.gov.bd লেখা আছে, সেটিতে প্রবেশ করুন। এটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর আপনি “এনআইডি অনলাইন সেবা” নামে একটি পেজ বা অপশন দেখতে পাবেন। এই অপশনটি সাধারণত হোমপেজে বা মেনু বারে থাকে। এটিতে ক্লিক করে এনআইডি সংক্রান্ত সেবার পেজে প্রবেশ করুন।
২. অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন বা লগইন
এনআইডি অনলাইন সেবা পেজে প্রবেশ করার পর আপনাকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
- যদি আপনার অ্যাকাউন্ট থাকে: আপনার এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে লগইন করুন।
- যদি অ্যাকাউন্ট না থাকে: “রেজিস্টার করুন” অপশনে ক্লিক করুন। এরপর আপনার এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ (দিন, মাস, বছর) এবং ছবিতে প্রদর্শিত ক্যাপচা কোডটি প্রবেশ করান। সাবমিট বাটনে ক্লিক করুন।
৩. মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশন
অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশনের পর আপনাকে মোবাইল নম্বর ভেরিফাই করতে হবে। এনআইডি কার্ড তৈরির সময় যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই নম্বরে একটি ভেরিফিকেশন কোড পাঠানো হবে। কোডটি প্রবেশ করিয়ে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
যদি মোবাইল নম্বর পরিবর্তন হয়ে থাকে: যদি আপনি পুরানো নম্বরটি আর ব্যবহার না করেন, তাহলে ওয়েবসাইটে “নতুন নম্বর সেট করুন” বা “যোগাযোগ করুন” নামে একটি অপশন পাবেন। সেখানে নতুন নম্বর যুক্ত করে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
৪. ফেস ভেরিফিকেশন
মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশনের পর আপনাকে ফেস ভেরিফিকেশন করতে হবে। এর জন্য আপনার স্মার্টফোনে NID Wallet অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- আপনার ফোনের Google Play Store বা App Store থেকে NID Wallet অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
- অ্যাপটি ইনস্টল করার পর ওয়েবসাইটে ফিরে এসে নিচের দিকে স্ক্রল করুন। সেখানে ফেস ভেরিফিকেশনের অপশন দেখতে পাবেন।
- ফেস ভেরিফিকেশনের জন্য ওয়েবসাইটে বা অ্যাপে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করুন। সাধারণত আপনাকে ক্যামেরার সামনে মুখ ধরে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা (যেমন: ডানে-বামে তাকানো) পালন করতে হবে।
- ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হলে একটি “ওকে” বাটন আসবে। এটিতে ক্লিক করুন।
৫. প্রোফাইল এডিট করা
ফেস ভেরিফিকেশনের পর আপনাকে আপনার প্রোফাইল পেজে নিয়ে যাওয়া হবে। এখানে “বিস্তারিত প্রোফাইল” বা “এডিট প্রোফাইল” নামে একটি অপশন থাকবে। এটিতে ক্লিক করে আপনি আপনার এনআইডি কার্ডের সমস্ত তথ্য দেখতে পাবেন। এখান থেকে আপনি যে তথ্য সংশোধন করতে চান, সেটি নির্বাচন করুন। উদাহরণস্বরূপ:
- নাম সংশোধন: যদি আপনার নাম বা বাবা-মায়ের নামের বানান ভুল থাকে, তাহলে “এডিট নাম” অপশনে ক্লিক করে সঠিক নাম টাইপ করুন।
- জন্মতারিখ সংশোধন: জন্মতারিখ বা জন্মসাল ভুল থাকলে সঠিক তথ্য প্রবেশ করান।
- ঠিকানা সংশোধন: বর্তমান ঠিকানা আপডেট করতে চাইলে সঠিক ঠিকানা লিখুন।
৬. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দেওয়া
তথ্য সংশোধনের পর আপনাকে কিছু ডকুমেন্ট আপলোড করতে হবে। এই ডকুমেন্টগুলো কর্তৃপক্ষ আপনার আবেদন যাচাই করার জন্য ব্যবহার করবে। সাধারণত নিম্নলিখিত ডকুমেন্টগুলো প্রয়োজন হয়:
| ডকুমেন্টের নাম | বিবরণ |
|---|---|
| একাডেমিক সার্টিফিকেট/মার্কশিট | এসএসসি, এইচএসসি বা অন্য কোনো শিক্ষাগত সার্টিফিকেটের স্ক্যান কপি। |
| জন্ম নিবন্ধন সনদ | জন্মতারিখ ও নাম যাচাইয়ের জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদের স্ক্যান কপি। |
| বাবা-মায়ের এনআইডি কার্ড | বাবা-মায়ের নাম সংশোধনের জন্য তাদের এনআইডি কার্ডের স্ক্যান কপি। |
| অন্যান্য প্রমাণপত্র | প্রয়োজন হলে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা অন্য কোনো পরিচয়পত্র। |
গুরুত্বপূর্ণ নোট: ডকুমেন্টগুলো স্ক্যান করে আপলোড করার সময় নিশ্চিত করুন যে সেগুলো পরিষ্কার এবং পড়া যায়। ঝাপসা বা অস্পষ্ট ডকুমেন্ট জমা দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
৭. ফি প্রদান
তথ্য সংশোধনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে। ফি প্রদানের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করুন। সাধারণত মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন: বিকাশ, নগদ) বা ক্রেডিট/ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করা যায়। ফি প্রদানের পর আপনি একটি পেমেন্ট রিসিপ্ট পাবেন, যা পরবর্তীতে প্রয়োজন হতে পারে।
৮. আবেদন জমা ও যাচাই
সমস্ত তথ্য এডিট করা এবং ডকুমেন্ট আপলোড করার পর “সাবমিট” বাটনে ক্লিক করুন। আপনার আবেদনটি নির্বাচন কমিশনে জমা হয়ে যাবে। কর্তৃপক্ষ আপনার জমা দেওয়া তথ্য এবং ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করবে। এই প্রক্রিয়ায় কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
যদি আপনার তথ্য এবং ডকুমেন্ট সঠিক থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষ আপনার আবেদন অনুমোদন করবে। আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে একটি এসএমএস-এর মাধ্যমে আপনাকে জানানো হবে। এরপর আপনি আপনার সংশোধিত এনআইডি কার্ড ডাউনলোড করতে পারবেন বা সংশোধিত কার্ড সংগ্রহের জন্য নির্দেশনা পাবেন।
এনআইডি কার্ড সংশোধনের সাধারণ সমস্যা সমাধান
এনআইডি কার্ড সংশোধনের সময় কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা দিতে পারে। নিচে এই সমস্যাগুলোর সমাধান দেওয়া হলো:
| সমস্যা | সমাধান |
|---|---|
| পুরানো মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা যায় না | ওয়েবসাইটে “নতুন নম্বর সেট করুন” অপশন ব্যবহার করুন বা নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন। |
| ফেস ভেরিফিকেশন ব্যর্থ হয় | পরিষ্কার আলোতে এবং সঠিক নির্দেশনা অনুসরণ করে পুনরায় চেষ্টা করুন। |
| ডকুমেন্ট প্রত্যাখ্যান হয় | ডকুমেন্ট পরিষ্কার এবং সঠিক কিনা তা যাচাই করুন। প্রয়োজনে নতুন করে আপলোড করুন। |
| আবেদন অনুমোদন হতে দেরি হয় | নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে আবেদনের অবস্থা জানুন। |
এনআইডি কার্ড সংশোধনের সুবিধা
এনআইডি কার্ড সংশোধন করলে আপনি নিম্নলিখিত সুবিধাগুলো পাবেন:
- সঠিক পরিচয় নিশ্চিতকরণ: সঠিক তথ্য সম্বলিত এনআইডি কার্ড আপনার পরিচয় যাচাইয়ে সহায়তা করে।
- ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন: সঠিক এনআইডি কার্ড ছাড়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা লেনদেনে সমস্যা হতে পারে।
- শিক্ষা ও চাকরি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা চাকরির আবেদনে সঠিক তথ্য প্রয়োজন।
- সরকারি সুবিধা: ভোটার তালিকায় নাম সংশোধন এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা পেতে সঠিক এনআইডি জরুরি।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস
- সঠিক তথ্য প্রদান: আবেদনের সময় সঠিক এবং যাচাইযোগ্য তথ্য প্রদান করুন।
- ডকুমেন্ট প্রস্তুত রাখুন: সব ডকুমেন্ট স্ক্যান করে প্রস্তুত রাখুন যাতে আপলোড করতে সুবিধা হয়।
- ইন্টারনেট সংযোগ: ফেস ভেরিফিকেশন এবং আবেদন জমা দেওয়ার সময় ভালো ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করুন।
- হেল্পলাইন: কোনো সমস্যা হলে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন।
শেষ কথা
এনআইডি কার্ড সংশোধন একটি সহজ এবং ঝামেলামুক্ত প্রক্রিয়া, যদি আপনি সঠিক নির্দেশনা অনুসরণ করেন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট এবং এনআইডি ওয়ালেট অ্যাপ ব্যবহার করে আপনি ঘরে বসেই এই কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। এই নিবন্ধে দেওয়া ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি সহজেই আপনার এনআইডি কার্ডের ভুল সংশোধন করতে পারবেন। আশা করি, এই লেখাটি আপনার জন্য সহায়ক হবে।










