বাংলা ভাষা আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ব্যাকরণ যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বহুমুখী। ব্যাকরণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো সমাস। সমাস এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একাধিক শব্দ মিলিয়ে একটি নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি হয়। এর ফলে বাক্য হয় সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং প্রাঞ্জল।
বাংলা সাহিত্যে, প্রবন্ধে, কবিতায় কিংবা দৈনন্দিন কথোপকথনে সমাসের ব্যবহার ভাষার সৌন্দর্য বাড়ায় বহুগুণে। এই নিবন্ধে আমরা সমাসের অর্থ, বৈশিষ্ট্য, প্রয়োজনীয়তা, প্রকারভেদ ও উদাহরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
সমাস কাকে বলে?
সমাস শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো “মিলন” বা “সংক্ষেপ”।
যখন দুটি বা একাধিক শব্দ মিলিয়ে এমন একটি শব্দ গঠন হয়, যা নতুন অর্থ প্রকাশ করে এবং আলাদাভাবে প্রতিটি শব্দের অর্থ সেই নতুন অর্থের সাথে সম্পর্কিত থাকে, তখন সেটাকে সমাস বলে।
সহজ সংজ্ঞা:
দুটি বা ততোধিক শব্দকে একত্রিত করে একটি নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করাকেই সমাস বলে।
উদাহরণ:
- মা + বাবা = মা-বাবা
- দিন + রাত = দিনরাত
সমাসের বৈশিষ্ট্য
সমাসের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্য শব্দ গঠনের প্রক্রিয়া থেকে একে আলাদা করে—
- বাক্যের দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনে।
- শব্দ গঠন হয় মসৃণ ও সহজ।
- অর্থ প্রকাশে স্পষ্টতা আসে।
- নতুন শব্দে একাধিক অর্থ মিলেমিশে থাকে।
- ভাষার সৌন্দর্য ও সংহতি বৃদ্ধি পায়।
সমাসের প্রয়োজনীয়তা
ভাষার সৌন্দর্য বাড়ানো ছাড়াও সমাস ব্যবহারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে—
- সংক্ষেপণ: দীর্ঘ বাক্যকে ছোট করা।
- প্রাঞ্জলতা: কথার ধারা মসৃণ করা।
- সৌন্দর্য বৃদ্ধি: সাহিত্যিক রচনায় নান্দনিকতা যোগ করা।
- অর্থের স্পষ্টতা: কম শব্দে বেশি অর্থ প্রকাশ।
সমাসের প্রকারভেদ
বাংলা ব্যাকরণে সমাস সাধারণত ছয়টি প্রধান ভাগে বিভক্ত—
- দ্বন্দ্ব সমাস
- দ্বিগু সমাস
- কর্মধারয় সমাস
- তৎপুরুষ সমাস
- বহুব্রীহি সমাস
- অব্যয়ীভাব সমাস
১. দ্বন্দ্ব সমাস
সংজ্ঞা:
যেখানে দুটি সমান গুরুত্ববাহী শব্দ একত্রিত হয়ে একটি নতুন শব্দ তৈরি করে, সেটিকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
উদাহরণ:
- মা-বাবা
- দিনরাত
- সুখদুঃখ
বৈশিষ্ট্য:
- উভয় শব্দ সমান প্রধান্য পায়।
- অর্থে মিল বা বিপরীততা থাকতে পারে।
দ্বন্দ্ব সমাসের প্রকার:
- সম্প্রদা দ্বন্দ্ব: ভিন্ন অর্থের শব্দ মিলে (যেমন: সুখদুঃখ)।
- সম্প্রস্তুত দ্বন্দ্ব: মিল অর্থের শব্দ মিলে (যেমন: মা-বাবা)।
২. দ্বিগু সমাস
সংজ্ঞা:
যেখানে প্রথম শব্দ সংখ্যা নির্দেশ করে, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
উদাহরণ:
- ত্রিকোণ (ত্রি + কোণ)
- দ্বিপদী (দ্বি + পদী)
বৈশিষ্ট্য:
- সংখ্যা নির্দেশক শব্দের ব্যবহার।
- স্পষ্ট পরিমাপ বা পরিমাণ বোঝায়।
৩. কর্মধারয় সমাস
সংজ্ঞা:
যেখানে প্রথম পদ বিশেষ্য এবং দ্বিতীয় পদ সেই পদের বিশেষণ, সেটি কর্মধারয় সমাস।
উদাহরণ:
- রাজপুত্র (রাজ + পুত্র)
- জ্ঞানপিপাসু (জ্ঞান + পিপাসু)
বৈশিষ্ট্য:
- প্রথম পদটি মূল বিষয়।
- দ্বিতীয় পদটি সেই বিষয়কে বিশেষিত করে।
৪. তৎপুরুষ সমাস
সংজ্ঞা:
যেখানে একটি শব্দের অধিকার বা সম্পর্ক অন্য শব্দের উপর থাকে, সেটি তৎপুরুষ সমাস।
উদাহরণ:
- আত্মসমর্পণ (আত্ম + সমর্পণ)
- দেশবরণ (দেশ + বরণ)
বৈশিষ্ট্য:
- সম্পর্ক নির্দেশ করে।
- প্রথম শব্দ প্রায়ই কারক বা বিভক্তি নির্দেশ করে।
৫. বহুব্রীহি সমাস
সংজ্ঞা:
যেখানে নতুন গঠিত শব্দটির অর্থ মূল শব্দগুলির অর্থের সাথে সরাসরি মেলে না, বরং অন্য অর্থ প্রকাশ করে।
উদাহরণ:
- জন্মান্ধ (জন্ম + অন্ধ)
- নদীমাতৃক (নদী + মাতৃক)
বৈশিষ্ট্য:
- এটি এক ধরনের বিশেষণ সমাস।
- আক্ষরিক অর্থের পরিবর্তে রূপক অর্থ প্রকাশ পায়।
৬. অব্যয়ীভাব সমাস
সংজ্ঞা:
যেখানে প্রথম পদটি অব্যয়, সেটিকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
উদাহরণ:
- অবধি
- সম্মুখে
বৈশিষ্ট্য:
- প্রথম পদ অব্যয়।
- বাক্যে ক্রিয়া বা অবস্থা বোঝায়।
সমাস চেনার সহজ উপায়
- শব্দগুলির মিলন প্রক্রিয়া লক্ষ্য করুন।
- মূল অর্থ নতুন শব্দে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে দেখুন।
- সংখ্যা, অব্যয়, বিশেষণ ইত্যাদির ভূমিকা বিশ্লেষণ করুন।
FAQ: সমাস সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন
সমাসের অংশ কয়টি?
ব্যাসবাক্য কী?
সমস্তপদ কাকে বলে?
করপল্লব কোন সমাস?
নদীমাতৃক কোন সমাস?
বাংলা ব্যাকরণে সমাস ভাষার গঠন, সৌন্দর্য ও প্রাঞ্জলতা বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি শুধু সাহিত্যিক রচনায় নয়, দৈনন্দিন কথাবার্তা ও লেখালেখিতেও সমানভাবে প্রয়োজনীয়।
সমাসের সঠিক ব্যবহার জানলে বাক্য হয় সংক্ষিপ্ত, অর্থপূর্ণ ও সুন্দর। তাই বাংলা ভাষার শিক্ষার্থী, লেখক ও ভাষাপ্রেমীদের জন্য সমাস শেখা অপরিহার্য।










