১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেলেও বাঙালিরা শীঘ্রই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে পড়েন। এই শাসকচক্র বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি এবং অধিকারের ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। তবে বাঙালিরা হার মানেনি। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তারা তাদের অধিকার রক্ষায় জয়ী হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে গঠন করে যুক্তফ্রন্ট, যার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা। যুক্তফ্রন্ট তাদের ২১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে বাঙালির অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে। এই লেখায় আমরা যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার মূল বিষয়বস্তু, এর পটভূমি এবং এর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
যুক্তফ্রন্ট গঠনের পটভূমি
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাঙালিদের জন্য জটিল হয়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালিদের মধ্যে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। এই আন্দোলনের ফলে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
১৯৫১ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নানা কৌশলে তা পিছিয়ে দেয়। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন ১৯৫৪ সালের মার্চে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলাম, একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। এই জোটের প্রতীক ছিল ‘নৌকা’। যুক্তফ্রন্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন করেন। ১৯৩৭ এবং ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পর নাজিম উদ্দিনের অগণতান্ত্রিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এই ক্ষোভ থেকেই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা বাঙালিদের যুক্তফ্রন্ট গঠনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার মূল দফা কি ছিল
যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তাদের ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই দফাগুলো ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট দলিল। নিচে এই ২১ দফার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
- বাংলা ভাষার স্বীকৃতি: বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এটি ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রধান দাবির প্রতিফলন।
- জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ: জমিদারি প্রথা এবং খাজনা আদায়কারী মধ্যস্বত্ব বিলোপ করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন করা হবে। উচ্চ খাজনা হ্রাস করা হবে এবং সার্টিফিকেটের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের প্রথা বন্ধ করা হবে।
- পাট শিল্পের জাতীয়করণ: পাট ব্যবসায় জাতীয়করণ করা হবে এবং পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হবে। মুসলিম লীগ শাসনামলে পাট কেলেঙ্কারির তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে।
- সমবায় কৃষি ও কুটিরশিল্প: সমবায় কৃষি পদ্ধতি চালু করা হবে এবং সরকারি সহায়তায় কুটিরশিল্পের উন্নয়ন করা হবে।
- লবণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: পূর্ব বাংলাকে লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে। মুসলিম লীগ শাসনামলে লবণ কেলেঙ্কারির তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে।
- বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন: বাস্তুহারাদের দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
- সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ: সেচ ব্যবস্থার উন্নতি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হবে।
- শিল্পায়ন ও শ্রমিক অধিকার: পূর্ব বাংলায় শিল্পায়ন করা হবে এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
- বিনামূল্যে শিক্ষা: বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে এবং শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো হবে।
- শিক্ষায় বাংলা ভাষা: সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবধান দূর করা হবে এবং বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করা হবে।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন: বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কঠোর আইন বাতিল করে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে।
- প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস: প্রশাসনিক ব্যয় কমানো হবে এবং কর্মচারীদের বেতনের সামঞ্জস্য করা হবে।
- দুর্নীতি প্রতিরোধ: ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করা হবে এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।
- সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: নিরাপত্তা বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং সংবাদপত্র ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হবে।
- বর্ধমান হাউসের ব্যবহার: বর্ধমান হাউসকে প্রথমে ছাত্রাবাস এবং পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণাগারে রূপান্তরিত করা হবে।
- শহিদ মিনার নির্মাণ: ভাষা আন্দোলনের শহিদদের সম্মানে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হবে।
- একুশে ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন: একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হবে এবং এটি সরকারি ছুটির দিন হবে।
- আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন: লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব বাংলায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। নৌবাহিনীর সদর দপ্তর, অস্ত্র কারখানা এবং আনসার বাহিনীকে মিলিশিয়া হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
- নিরপেক্ষ নির্বাচন: মন্ত্রিসভার মেয়াদ বাড়ানো হবে না। নির্বাচনের ছয় মাস আগে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করবে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
- আইনসভার শূন্যপদ পূরণ: আইনসভার শূন্যপদ তিন মাসের মধ্যে পূরণ করা হবে। পরপর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী পরাজিত হলে মন্ত্রিসভা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবে।
যুক্তফ্রন্টের তাৎপর্য
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের আকাঙ্ক্ষার একটি প্রতিফলন। এই দফাগুলো শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা ছিল। এই কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে একটি নতুন আশার সঞ্চার করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির শক্তি প্রদর্শন করে।
এই ২১ দফা পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন
যুক্তফ্রন্ট ছিল ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি জোট। এটি মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত হয়েছিল।
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘নৌকা’।
২১ দফার প্রথম দফায় বলা হয়েছিল, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে জাগ্রত করেছিল, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শেষ কথা
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই দফাগুলো বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি সুস্পষ্ট দাবি উপস্থাপন করেছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির শক্তি ও ঐক্যের প্রমাণ দেয়। এই ২১ দফা কেবল তৎকালীন সময়ের জন্যই নয়, বরং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্যও একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই দফাগুলো বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার চেতনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।










