বাংলাদেশে যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বা দলিলের সত্যতা প্রমাণ করতে হয়, তখন নোটারি পাবলিকের নামটা প্রায়ই কানে আসে। অনেকে জানেন না যে এটি কী এবং কেন এটি করতে হয়। আজকের এই লেখায় আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো নোটারি পাবলিক কী, এর প্রয়োজন কোথায় পড়ে, কোথায় করা যায় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নোটারি পাবলিক খরচ কত। এই তথ্যগুলো জানলে আপনার কাজ সহজ হয়ে যাবে, বিশেষ করে যদি আপনি জমি-জমা কেনাবেচা, বিদেশ যাওয়া বা আইনি কাজের সাথে যুক্ত থাকেন। চলুন, ধাপে ধাপে বুঝে নিই।
নোটারি পাবলিক কাকে বলে
নোটারি পাবলিক হলো একটি সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো দলিল বা কাগজপত্রের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি আপনার মূল ডকুমেন্টের একটা কপি তৈরি করে সেটাকে আইনত বৈধ করে তোলে। বাংলাদেশে এই কাজটি সাধারণত অভিজ্ঞ আইনজীবীরা করেন, যাদের সরকার বিশেষ অনুমতি দেয়।
উদাহরণস্বরূপ, ধরুন আপনার কাছে একটা জন্ম সনদ আছে। আপনি সেটার ফটোকপি নিয়ে একজন নোটারি পাবলিকের কাছে যাবেন। তিনি মূল সনদটি দেখে কপিটা যাচাই করবেন। তারপর কপিতে নিজের স্বাক্ষর, সিল এবং একটা লাল রঙের গোলাকার রাবার স্ট্যাম্প লাগিয়ে দেবেন। এই স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিকের নাম এবং অনুমোদন নম্বর থাকে। মনে রাখবেন, নোটারি কখনোই মূল দলিলে কিছু লাগান না; শুধু কপিতে হয়। এতে মূল কাগজ নিরাপদ থাকে।
বাংলাদেশে নোটারি পাবলিকের এই ব্যবস্থা নোটারিস অর্ডিন্যান্স এবং নোটারিস রুলস ১৯৬৪-এর অধীনে চলে। এই আইনগুলো নিশ্চিত করে যে শুধু যোগ্য ব্যক্তিরাই এই কাজ করতে পারেন। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন প্রথা আছে, যেমন ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু আমাদের দেশে এটি বিশেষ করে আইনি এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য অপরিহার্য। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট যেমন শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা চুক্তিপত্র সত্যায়িত করতে হলে নোটারি পাবলিক ছাড়া চলে না। এটি না করলে আপনার কাগজপত্র অবৈধ বলে গণ্য হতে পারে, যা বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
নোটারি পাবলিক কেন করতে হয়?
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নোটারি পাবলিকের প্রয়োজন পড়ে, কারণ এটি আপনার ডকুমেন্টের আসলত্ব প্রমাণ করে। সাধারণত, যখন মূল কাগজ জমা দিতে না চান বা বিপদের আশঙ্কা থাকে, তখন কপি সত্যায়িত করে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বিদেশি দূতাবাস বা আদালতে কাগজ জমা দেওয়ার সময় এটি বাধ্যতামূলক।
উদাহরণ দিয়ে বলি: আপনি যদি বিদেশে ভিসা আবেদন করেন, তাহলে আপনার শিক্ষাগত সনদপত্র বা চারিত্রিক সনদ নোটারি করে জমা দিতে হয়। একইভাবে, জমি কেনাবেচার সময় দলিলপত্র সত্যায়িত না করলে লেনদেন অবৈধ হয়ে যেতে পারে। হলফনামা বা বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও এটি দরকার। নোটারি না করলে আপনার কথা বা ডকুমেন্টের উপর কেউ বিশ্বাস করবে না, যা আইনি জটিলতা বাড়ায়।
কিছু সাধারণ ক্ষেত্র যেখানে নোটারি পাবলিক করতে হয়
- জমি-জমা সংক্রান্ত দলিল বা দস্তাবেজ।
- হলফনামা বা শপথপত্র।
- বিবাহবিচ্ছেদ বা পরিবারিক ডকুমেন্ট।
- গাড়ি বা সম্পত্তি বেচাকেনা।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট।
- চারিত্রিক সনদপত্র।
- জন্ম বা মৃত্যুর সনদ।
- বিদেশে নাগরিকত্ব বা অভিবাসনের আবেদন।
এই কাজগুলোতে নোটারি পাবলিক না করলে আপনার সময় এবং অর্থ নষ্ট হতে পারে। তাই সবসময় এটি করে নেওয়াই ভালো।
নোটারি পাবলিক কোথায় করা হয়
বাংলাদেশের যেকোনো জেলা বা থানা কোর্টের আশেপাশে নোটারি পাবলিক পাওয়া যায়। সরকার অভিজ্ঞ আইনজীবীদের এই দায়িত্ব দেয়, তাই আপনি আপনার স্থানীয় আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে তাদের খুঁজে পাবেন। ঢাকায় হাইকোর্টের কাছে বা চট্টগ্রাম, সিলেটের কোর্টে অনেক নোটারি পাবলিক রয়েছেন।
প্রক্রিয়াটি খুব সহজ: আপনার মূল ডকুমেন্ট আর কপি নিয়ে যান। নোটারি আইনজীবী মূলটি যাচাই করবেন। আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে, কারণ তিনি আপনার পরিচয় যাচাই করবেন। যদি সব ঠিক থাকে, তাহলে কপিতে সিলমোহর লাগিয়ে দেবেন। এই কাজটি সাধারণত ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যে হয়ে যায়। কিন্তু ভিড়ের সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। অনলাইনে কিছু তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের কাজের জন্য সরাসরি যাওয়াই ভালো।
নোটারি পাবলিক খরচ কত
এটাই হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রশ্ন: নোটারি পাবলিক করাতে কত টাকা লাগে? সরকার নির্ধারিত ফি খুব কম। সাধারণ সত্যায়নের জন্য মাত্র ১০ টাকা। যদি হলফনামা বা চুক্তিপত্রের মতো জটিল কাজ হয়, তাহলে ২০-২৫ টাকা। এছাড়া, কাগজের খরচ বা ছোটখাটো ফি যোগ হতে পারে, যা মোট ৫০-১০০ টাকার মধ্যে থাকে।
কিন্তু অনেক আইনজীবী বাড়তি টাকা চাইতে পারেন, যেমন ৫০০-১০০০ টাকা। এতে আপনার অধিকার লঙ্ঘন হয়। সরকারি নিয়ম অনুসারে আপনি শুধু নির্ধারিত ফি দিয়ে কাজ করাতে পারেন। যদি বেশি চান, তাহলে অন্য নোটারি খুঁজে নিন। এতে আপনার সময় এবং অর্থ বাঁচবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে খরচ আরও কম হয়।
নোটারি পাবলিক হওয়ার যোগ্যতা কঠোর। নোটারিস অর্ডিন্যান্স অনুসারে, কমপক্ষে ৭ বছরের অভিজ্ঞ আইনজীবী, বা ৫ বছরের বিচারক, বা সরকারি আইনি খসড়াকারী ব্যক্তিরা এই পদ পেতে পারেন। সরকার তাদের অনুমোদন দেয় এবং নিয়মিত তত্ত্বাবধান করে। এতে নিশ্চিত হয় যে কাজটি সঠিকভাবে হয়। সাধারণ মানুষ এটি করতে পারেন না; শুধু যোগ্য পেশাদাররাই।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন
না, গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য নোটারি বাধ্যতামূলক। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে ছোটখাটো সত্যায়ন হয়, কিন্তু আইনি কাজে নোটারি দরকার।
সাধারণত কোনো মেয়াদ নেই, কিন্তু নোটারির অনুমোদন মেয়াদ শেষ হলে নতুন করতে হয়। আপনার ডকুমেন্টের বৈধতা ডকুমেন্টের উপর নির্ভর করে।
এখনও বাংলাদেশে পুরোপুরি অনলাইন হয় না। কিন্তু ভবিষ্যতে ডিজিটাল সিস্টেম আসতে পারে। এখন সরাসরি যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সরকারি ফি একই, কিন্তু ব্যক্তিগত চার্জ ভিন্ন হতে পারে। সরকারি নিয়ম মেনে চলুন।
হ্যাঁ, বাংলাদেশি দূতাবাসে করা যায়, কিন্তু দেশের নোটারি দিয়ে শুরু করাই ভালো।
নোটারি পাবলিক একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যা আমাদের দৈনন্দিন আইনি কাজকে সহজ করে। আজকের লেখায় আমরা দেখলাম যে নোটারি পাবলিক কী, কেন এবং কোথায় করতে হয়, এবং খরচ মাত্র ১০-২৫ টাকা। এটি জেনে আপনি এখন আর কোনো চিন্তায় থাকবেন না। যদি কোনো দলিল সত্যায়ন করার দরকার হয়, তাহলে স্থানীয় কোর্টে গিয়ে কাজ শুরু করুন। এতে আপনার সময় এবং অর্থ বাঁচবে। আশা করি এই তথ্য আপনার কাজে লাগবে। আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ।










