মানুষের জীবনধারা, সমাজ আর প্রাকৃতিক জগত সব কিছুর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরিবেশ। আমরা শ্বাস নিতে যে বাতাস পাই, পানি খাই, খাদ্য উৎপাদন করি কিংবা প্রতিদিন যেসব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করি সবই পরিবেশের অংশ। তাই পরিবেশকে বোঝা, তার বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে জানা এবং সংরক্ষণের উপায় খুঁজে বের করা আজকের দিনে অত্যন্ত জরুরি।
পরিবেশ কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি
পরিবেশ হলো জীবজগত এবং তাদের চারপাশের জড় উপাদানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের সমষ্টি। সহজভাবে বললে, মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, মাটি, পানি আর বায়ুর সাথে আমাদের প্রতিনিয়ত যে মিথস্ক্রিয়া হয়, সেটিই পরিবেশ।
পরিবেশ কত প্রকার
বিজ্ঞানীরা পরিবেশকে সাধারণত চার ভাগে ভাগ করেছেন—
- প্রাকৃতিক পরিবেশ
- সামাজিক পরিবেশ
- ভৌত পরিবেশ
- কৃত্রিম পরিবেশ
প্রাকৃতিক পরিবেশ
এটি প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্ট এক পরিবেশ, যেখানে পাহাড়, নদী, বন, সাগর, বাতাস, মাটি আর প্রাণী-উদ্ভিদ বিদ্যমান। মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই এটি গড়ে ওঠে। খাদ্য, পানি, অক্সিজেন—সবই আমরা এই পরিবেশ থেকে পাই। কিন্তু শিল্পায়ন, বনভূমি ধ্বংস আর দূষণ প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক পরিবেশ
মানুষের সম্পর্ক, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা আর নৈতিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে যে পরিবেশ তৈরি হয়, সেটিই সামাজিক পরিবেশ। একটি গ্রামে পারস্পরিক সহযোগিতা, উৎসব-আনন্দ কিংবা শহরের সংস্কৃতি—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক পরিবেশে অশান্তি বা বিভেদ দেখা দিলে সমাজ পিছিয়ে যায়।
ভৌত পরিবেশ
এটি পৃথিবীর শারীরিক গঠন এবং ভূপ্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত। পাহাড়, নদী, জলবায়ু, মাটি, প্রাকৃতিক সম্পদ—সবই ভৌত পরিবেশের অংশ। মানুষের কার্যক্রম যেমন সড়ক তৈরি বা নগরায়ণও এই পরিবেশকে পরিবর্তন করে।
কৃত্রিম পরিবেশ
মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে তোলা পরিবেশকে বলা হয় কৃত্রিম পরিবেশ। শহর, দালান, সড়ক, শিল্প এলাকা—সবই কৃত্রিম পরিবেশ। এটি আধুনিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি করে পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
পরিবেশের উপাদান
পরিবেশ মূলত দুই ধরনের উপাদানে গঠিত—
- জীব উপাদান (Biotic): উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ, মাইক্রোঅর্গানিজম।
- অজীব উপাদান (Abiotic): মাটি, পানি, আলো, তাপমাত্রা, বাতাস।
এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে।
পরিবেশের প্রধান পাঁচটি উপাদান
- মাটি – খাদ্য উৎপাদনের মূল উৎস।
- পানি – জীবনের জন্য অপরিহার্য।
- বায়ু – শ্বাস-প্রশ্বাস ও জীবনের শক্তি।
- উদ্ভিদ ও প্রাণী – খাদ্যচক্র ও জীববৈচিত্র্যের মূল অংশ।
- আলো ও তাপ – সূর্যের শক্তি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব নেই।
পরিবেশের গুরুত্ব
পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি—
- আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে
- জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে
- জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে
- মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়
পরিবেশ ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না।
পরিবেশ সংরক্ষণের উপায়
আজকের পৃথিবীতে পরিবেশ রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়ঙ্কর সংকটে পড়বে। কিছু কার্যকর উপায় হলো—
১. গাছ লাগানো ও বনভূমি সংরক্ষণ
প্রতিটি মানুষ বছরে অন্তত একটি গাছ লাগালে পরিবেশ অনেকটাই সুস্থ থাকবে।
২. প্লাস্টিক কমানো
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিহার করে কাগজ, কাপড় বা পাটের জিনিস ব্যবহার করতে হবে।
৩. পুনর্ব্যবহার (Recycle)
কাচের বোতল, পুরনো কাগজ, কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব।
৪. পরিবেশ শিক্ষা
স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে সামাজিক প্রচারণা—সব জায়গায় পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা প্রচার করতে হবে।
৫. পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
Solar power, wind energy, electric vehicle—এসব ব্যবহার করে দূষণ কমানো সম্ভব।
৬. সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করা, কম্পোস্ট তৈরি করা এবং পুনর্ব্যবহার করা উচিত।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশ মানে হলো চারপাশের গাছ, পশুপাখি, পানি, আলো ও বাতাস। তারা বোঝে পরিবেশ ছাড়া জীবন নেই। ছোটবেলা থেকে যদি তাদের পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা সচেতন প্রজন্ম হয়ে উঠবে।
লেখকের শেষ কথা
পরিবেশ আমাদের জীবনের মূল ভরসা। আমরা যতই আধুনিক হচ্ছি, ততই পরিবেশ ধ্বংস করছি। বন কাটছি, প্লাস্টিক ব্যবহার করছি, নদী দূষণ করছি। অথচ একটুখানি সচেতন হলেই পরিবেশকে বাঁচানো সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে পৃথিবী আমাদের নয়, আমরা পৃথিবীর। তাই গাছ লাগানো, প্লাস্টিক বর্জন, পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর সচেতনতা এই ছোট ছোট কাজগুলোই পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রাখবে।










